কেন 'শূন্য'তেই থমকে যাচ্ছেন অভিষেক শর্মা? তিন ম্যাচ, শূন্য রান—চাপেই কি ভেঙে পড়ছেন ভারতের তারকা ওপেনার? অভিষেককে নিয়ে সোজাসাপ্টা গাভাস্কার...
টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬-এ টানা ব্যর্থতায় চাপে অভিষেক শর্মা। তিন ম্যাচে শূন্য রানের পর তাঁর মানসিকতা ও ব্যাটিং পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুনীল গাভাসকর পরামর্শ দিয়েছেন ধৈর্য ধরে ‘স্মার্ট ক্রিকেট’ খেলতে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সুপার এইট ম্যাচে কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন ভারতীয় ওপেনার?

টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরুর আগে ভারতীয় ক্রিকেটপ্রেমীদের অন্যতম ভরসার নাম ছিল অভিষেক শর্মা। বিশ্ব টি২০ র্যাঙ্কিংয়ে এক নম্বর ব্যাটার হিসেবে তাঁর ওপর প্রত্যাশার চাপ ছিল স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু গ্রুপ পর্ব শেষ হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। তিনটি ম্যাচ খেলেও তিনি কোনো রান করতে পারেননি। সামনে সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, আর সময় খুব বেশি নেই ঘুরে দাঁড়ানোর। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয় ব্যাটিং কিংবদন্তি সুনীল গাভাসকর গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন তরুণ ওপেনারকে।
বিশ্বকাপ মঞ্চে অভিষেকের কঠিন সময়!
২০২৬ সালের টি২০ বিশ্বকাপে অভিষেক শর্মার শুরুটা মোটেই স্বস্তিদায়ক হয়নি। তিন ম্যাচ মিলিয়ে তিনি মোটে আট বল ক্রিজে টিকে ছিলেন। একজন ওপেনারের ক্ষেত্রে এমন পরিসংখ্যান অবশ্যই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে যখন তিনি দলের অন্যতম প্রধান স্ট্রাইক রেট নির্ভর ব্যাটার হিসেবে পরিচিত।
টি২০ ফরম্যাটে দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা অভিষেককে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক মনোভাব অনেক সময় উল্টো ফলও দিতে পারে। এবারের টুর্নামেন্টে ঠিক সেটাই ঘটছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
আরো পড়ুন: অভিষেকের শূন্যের হ্যাটট্রিকের বোঝা নিয়েই সুপার এইটে মাঠে নামবে ভারত
অভিষেকের থেকে প্রত্যাশার চাপই কি তাহলে বড় কারণ?
স্টার স্পোর্টসে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সুনীল গাভাসকর সরাসরি বলেন, প্রত্যাশার চাপই হয়তো অভিষেকের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলছে। তাঁর মতে, প্রথম ম্যাচে ভালো শুরু পেলে হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতে পারত। কিন্তু শুরুর ব্যর্থতা মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গাভাসকর বলেন, একজন তরুণ ক্রিকেটার যখন ‘নম্বর ওয়ান’ তকমা নিয়ে মাঠে নামেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ওপর বাড়তি নজর থাকে। দর্শক, মিডিয়া এবং দলের ভরসা—অর্থাৎ, একটি মানসিক বোঝা তৈরি হয়। সেই চাপ থেকে মুক্ত থাকতে পারলে পারফরম্যান্স অনেক বেশি স্বাভাবিক হয়।
আক্রমণ নয়, দরকার ধৈর্য!
অভিষেক শর্মার ব্যাটিং স্টাইল মূলত পাওয়ার-হিটিং নির্ভর। ইনিংসের শুরু থেকেই বড় শট খেলার প্রবণতা তাঁর স্বাভাবিক খেলায় দেখা যায়। কিন্তু গাভাসকর মনে করেন, প্রতিটি ইনিংস বাউন্ডারি বা ছক্কা দিয়ে শুরু করার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, কয়েকটি ডট বল খেললেও সমস্যা নেই। প্রথমে উইকেটে সময় কাটানো জরুরি। সিঙ্গেল-ডাবল নিয়ে শরীরকে ছন্দে আনতে হবে। পিচের গতি ও বাউন্স বোঝার জন্য কিছুটা সময় নেওয়া দরকার। একবার সেট হয়ে গেলে বড় শট আসবেই।
টি২০ ক্রিকেটে স্ট্রাইক রেট গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি ধরে রাখার জন্য প্রাথমিক ধৈর্য সমানভাবে প্রয়োজন। গাভাসকরের মতে, অভিষেকের বর্তমান আউট হওয়ার ধরন বেশ অনুমানযোগ্য হয়ে উঠেছে। বোলাররা জানেন তিনি প্রথম থেকেই লাইন পার করে বড় শট মারতে চাইবেন। ফলে পরিকল্পনা করাও সহজ হয়ে যাচ্ছে প্রতিপক্ষের জন্য।
‘স্মার্ট ক্রিকেট’-এর বার্তা!
গাভাসকর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন ‘স্মার্ট ক্রিকেট’-এর ওপর। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক স্তরে খেলতে হলে পরিস্থিতি বুঝে ব্যাটিং করতে হয়। প্রতিটি ম্যাচ, প্রতিটি পিচ আলাদা।
প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত রান খাতা খোলা। একজন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের জন্য শূন্য রানে আউট হওয়া মানসিকভাবে বড় ধাক্কা। তাই শুরুতে ঝুঁকি কমিয়ে সিঙ্গেল নেওয়া, শরীরের মুভমেন্ট ঠিক করা এবং বলের গতি বোঝা—এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, স্ট্রাইক রেট ২০০ রাখতে হবে—এই চিন্তা নিয়ে খেলতে গেলে স্বাভাবিক খেলা নষ্ট হয়ে যায়। টি২০ ক্রিকেটে বড় ইনিংস গড়তে হলে প্রথম ১০-১৫ বল টিকে থাকাই মূল চাবিকাঠি।
আরো পড়ুন: অবসর ঘোষণা করলেন এই প্রাক্তন অধিনায়ক!
পরিসংখ্যান, যা উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে!
সাম্প্রতিক আউটের পর ২০২৬ সালে টি২০ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক শর্মার পাঁচটি ‘ডাক’ হয়ে গেছে। একজন ওপেনারের ক্ষেত্রে একটি ক্যালেন্ডার বছরে এতগুলো শূন্য রানের নজির খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।
তবে পরিসংখ্যান সব সময় পুরো গল্প বলে না। অনেক সময় ফর্মের ওঠানামা স্বাভাবিক বিষয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, খেলোয়াড় কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেন এবং দ্রুত ঘুরে দাঁড়ান।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ: দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ!
ভারতের পরবর্তী ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে, যা সুপার এইট পর্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের সামনে অভিষেকের পরীক্ষা আরও কঠিন হতে পারে। তবে বড় মঞ্চে বড় খেলোয়াড়রাই নিজেদের প্রমাণ করেন।
দলের জন্য ইতিবাচক দিক হলো, এখনও টুর্নামেন্ট শেষ হয়ে যায়নি। একটি বড় ইনিংস পুরো ছবিটাই বদলে দিতে পারে। ক্রিকেটে আত্মবিশ্বাস অনেক সময় একটি ভালো শট বা একটি ছোট পার্টনারশিপ থেকেই ফিরে আসে।
মানসিক দৃঢ়তা ও প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা কতটা অভিষেকের?
অভিষেক শর্মা তরুণ, প্রতিভাবান এবং ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। ফর্মের এই সাময়িক মন্দা তাঁর সামগ্রিক দক্ষতার প্রতিফলন নয়। বরং এটি হতে পারে শেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ব্যর্থতা যেমন বড়, সাফল্যও তেমনই ঐতিহাসিক। গাভাসকরের পরামর্শ যদি তিনি কাজে লাগাতে পারেন—প্রথমে উইকেটে সময় দেওয়া, সিঙ্গেল নিয়ে ছন্দে ফেরা এবং পরিস্থিতি বুঝে আক্রমণ করা—তাহলে প্রত্যাবর্তন খুব দূরে নয়।
টি২০ বিশ্বকাপ ২০২৬-এ অভিষেক শর্মার শুরু হতাশাজনক হলেও আশা এখনও ফুরিয়ে যায়নি। প্রত্যাশার চাপ সামলে ‘স্মার্ট ক্রিকেট’ খেলতে পারলে তিনি আবারও দলের অন্যতম ভরসা হয়ে উঠতে পারেন।
সুতরাং, এটা একেবারে স্পষ্ট যে, ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। আজ যিনি শূন্য, কাল তিনিই ম্যাচের নায়ক।
ট্যাগ:
Souvik Das
editor





