৬ বারের বিশ্বজয়ী দলের এমন দশা! বিশ্বকাপে টিকে থাকতে এখন অন্যের ফলাফলের অপেক্ষা করতে হচ্ছে অস্ট্রেলিয়াকে!
টানা দুই হারে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে চাপে অস্ট্রেলিয়া। জিম্বাবোয়ে ও শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে পরাজয়ের পর সুপার এইটে ওঠার সম্ভাবনা এখন নির্ভর করছে অন্য দলের ফলাফলের উপর। পেস আক্রমণে অভিজ্ঞদের অনুপস্থিতি, ব্যাটিং ধস ও দল নির্বাচনে বিতর্ক— সুতরাং, অজি শিবিরে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী দলের এমন পরিস্থিতি খুব কমই দেখা গেছে। এক সময় সীমিত ওভারের ক্রিকেটে যাদের আধিপত্য ছিল প্রায় অপ্রতিরোধ্য, সেই দলই এখন গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের শঙ্কায়। টানা দুই ম্যাচে হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর তাদের সুপার এইটে ওঠা নির্ভর করছে অন্য দলের ফলাফলের উপর।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে টুর্নামেন্ট শুরু করলেও বর্তমান বাস্তবতা অস্ট্রেলিয়ার জন্য কঠিন। বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে নিচে থাকা দলের কাছে হার এবং সহ-আয়োজক দলের বিরুদ্ধে একতরফা পরাজয়—সব মিলিয়ে দলটির আত্মবিশ্বাসে স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে।
টানা দুই ম্যাচে হার, গ্রুপ পর্বেই বিপদ!
অস্ট্রেলিয়া প্রথমে বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের ১১ নম্বর দল Zimbabwe national cricket team-এর কাছে ২৩ রানে হারে। সেই ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ক্যান্ডিতে সহ-আয়োজক Sri Lanka national cricket team-এর কাছে আট উইকেটের ব্যবধানে পরাজিত হয়।
এই দুই ম্যাচের ফলাফল তাদের পয়েন্ট তালিকায় পিছিয়ে দিয়েছে এবং এখন সুপার এইটে উঠতে হলে ১২ নম্বরে থাকা Ireland national cricket team-এর জয় কামনা করতে হচ্ছে। একইসঙ্গে শ্রীলঙ্কার কাছেও প্রত্যাশা, তারা যেন জিম্বাবোয়েকে হারায়।
আরো পড়ুন: দলে ফেরার দাবিতে আগুন ঝরাচ্ছেন শামি!
দলের অধিনায়ক Mitchell Marsh স্বীকার করেছেন যে এখনও সম্ভাবনা আছে, তবে ভাগ্যের সহায়তা লাগবে। এই মন্তব্যেই স্পষ্ট, পরিস্থিতি কতটা কঠিন।
অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক সাফল্যের বড় ভিত্তি ছিল তাদের অভিজ্ঞ পেস ত্রয়ী—Mitchell Starc, Pat Cummins এবং Josh Hazlewood। স্টার্ক টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন, আর কামিন্স ও হ্যাজেলউড চোটের কারণে বাইরে।
এক দশকেরও বেশি সময় পর এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপে অন্তত একজন শীর্ষ পেসার ছাড়া নামতে হয়েছে দলটিকে। ফলে নতুন ও ব্যাক-আপ বোলারদের উপর চাপ বেড়েছে। নেতৃত্বে থাকা Nathan Ellis চেষ্টা করলেও ধারাবাহিক প্রভাব ফেলতে পারেননি।
অভিজ্ঞ লেগস্পিনার Adam Zampa-ও দুই ম্যাচে উইকেটশূন্য থাকেন, যা প্রতিপক্ষ ব্যাটারদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছে।
শুধু বোলিং নয়, ব্যাটিং লাইন-আপও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ওপেনিং জুটি ৮.৩ ওভারে ১০৪ রান তুললেও পরের ধস ছিল নাটকীয়। মাত্র ৭৭ রানের মধ্যে ১০ উইকেট হারায় দলটি।
Travis Head শুরুটা ভালো করলেও মাঝের সারির ব্যাটাররা স্পিন আক্রমণের সামনে দিশেহারা হয়ে পড়েন। বিশেষ করে Cameron Green, Marcus Stoinis এবং Tim David—এই তিনজনই পরপর দুই ম্যাচে দুই অঙ্কে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন।
টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে যেখানে দ্রুত রান তোলা জরুরি, সেখানে ধারাবাহিকতা ও ম্যাচ পরিস্থিতি বোঝার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
আরো পড়ুন: শ্রীলঙ্কা বনাম অস্ট্রেলিয়া: নিসাঙ্কার সেঞ্চুরিতেই বদলে গেল সব সমীকরণ!
প্রস্তুতি ও নির্বাচন নিয়ে উঠছে প্রশ্ন!
বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া বিগ ব্যাশ লিগ দীর্ঘায়িত হওয়ায় খেলোয়াড়রা সময়মতো প্রস্তুতি ম্যাচে যোগ দিতে পারেননি। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রস্তুতি সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হার দলটির দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়।
এর পাশাপাশি স্কোয়াড নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। অভিজ্ঞ ব্যাটার Steve Smith বিগ ব্যাশে দারুণ ফর্মে থাকলেও প্রথমে দলে জায়গা পাননি। যদিও পরবর্তীতে চোটের কারণে তাকে দলে নেওয়া হয়, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে একাদশে সুযোগ না পাওয়ায় সমর্থকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে Matt Renshaw জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে ৬৫ ও আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৩৭ রান করার পরও একাদশ থেকে বাদ পড়েন। সিদ্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মধ্যেও আলোচনা চলছে।
সমালোচকদের মত: পরিকল্পনায় ঘাটতি!
সাবেক অস্ট্রেলিয়া ব্যাটার Mark Waugh মন্তব্য করেছেন, চোট ও নির্বাচনের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পুরো প্রচারণাই শুরু থেকেই সমস্যায় ছিল। তার মতে, সেরা ফর্মে থাকা খেলোয়াড়কে বাইরে রেখে পরিকল্পনা করা দলের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরে বড় টুর্নামেন্টে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার ঐতিহ্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু বর্তমান দলটিতে সেই স্বচ্ছ পরিকল্পনা ও ভারসাম্য অনুপস্থিত।
আগামীদিনে কী অপেক্ষা করছে?
অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখনও একটি গ্রুপ ম্যাচ বাকি রয়েছে ওমানের বিরুদ্ধে। তবে সেটির আগে অন্য ম্যাচের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি সমীকরণ তাদের পক্ষে না যায়, তবে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হতে পারে—যা হবে সাম্প্রতিক ইতিহাসে বড় ধাক্কা।
একসময় ছয়বারের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপজয়ী এবং ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি চ্যাম্পিয়ন দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সুনাম ছিল প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তাদের নতুন করে পরিকল্পনা, দলগঠন ও প্রস্তুতির দিকে নজর দিতে হবে।


